রাজার লড়াই….

আসিফ আবদুল্লাহ

১৬ এপ্রিল, ২০০৮। সকাল ১০ টা। সাইফুল শুধু ভাবছে কখন দুপুর তিনটা বাজবে। ঘুম থেকে উঠে পড়ার টেবিলে বসলেও পড়া হয়নি এক ফোটা। শুধুমাত্র আব্বু আম্মুকে দেখানোর জন্য টেবিলে বসে আছে সাইফুল। মাথায় ঘুরছে, কখন বাজবে তিনটা। সময় যেন যাচ্ছেই না। নাস্তা করে খেলতে যাবে, সেটাও হচ্ছে না। সকাল ১১ টার দিকে বাইরে বের হয়ে শুধু বন্ধুদের খেলা দেখেই বাসায় চলে এল সাইফুল।

দুপুর একটার মধ্যে গোসল শেষ করে নামাজটা আদায় করে নিল। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অবশ্য দুপুর ২ টা ৩০ থেকেই ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে টিভির সামনে সাইফুল। এ ব্যাপারটা একদমই পছন্দ করেন না সাইফুলের মা। কথা শুনিয়েই যাচ্ছেন। কে শোনে কার কথা। সাইফুল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে টিভির স্ক্রিনে।

টস হল। টসে জিতে আশরাফুল ব্যাটিং নিলেন। আজকের ম্যাচটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর আগের ৩ ম্যাচেই হেরে সিরিজ হেরে গিয়েছে বাংলাদেশ। আজকের ম্যাচটি সিরিজের চতুর্থ ম্যাচ। খেলা শুরু হতে এখনো মিনিট পনেরোর মত বাকি।

সাইফুলের মনে পড়ে গেল সেই ২০০৩ সালের পাকিস্তান ট্যুরের কথা। সেবার চতুর্থ ম্যাচে ২২৩ রানের টার্গেট দিয়েছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তান ১ বল বাকি রেখেই ম্যাচটি জিতে নেয় ৫ উইকেটে। ৫ বছর পর আজকেও বাংলাদেশ টসে জিতে ব্যাটিংয়ে। দেখা যাক আজ কি হয়!

পাকিস্তান দল খুবই শক্তিশালী। জেতার তেমন আশা নেই। কিন্তু দলে আছেন আশরাফুল আফতাব মাশরাফি। আজকে হয়ত কিছু হবে। সেই আশায় বুক বেধে খেলা দেখতে শুরু করল সাইফুল। মোহাম্মদ আসিফকে সাইফুল রীতিমত ভয় পায় বলা চলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুইং বোলিংয়ের জন্য তাঁর অনেক নাম ডাক। আজকেই সিরিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেছেন আসিফ।

তামিমের সাথে জুনায়েদ সিদ্দিকি খেলতে নেমেছেন। তামিম শুরু করলেন আসিফকে চার মেরে। মনের খুশিতে দুই লোকমা ভাত মুখে তুলে নিল সাইফুল। আজকে হয়ত ভালো কিছুই হবে।

প্রথম ওভার শেষ। অপর প্রান্ত থেকে উমর গুল শুরু করলেন। জুনায়েদ আউট হয়ে গেলেন শুন্য রানে। এবার মন খারাপ করে এক লোকমা ভাত মুখে নিল সাইফুল। একদিনও ওপেনিং জুটিটা সাইফুলের মনের মত খেলতে পারে না। কিছুটা অভিমান জাগে মনে। যা হবার তা তো হলই।

আফতাব নামবেন। তামিম আর আফতাব মিলে ১০ ওভারে ৫০ রান তুলে দিলেই হবে। দুই বল পরেই আফতাব ফিরলেন গুলের বলে। এই ধাক্কা হজম করার আগেই তৃতীয় ওভারের শেষ বলে সেই আসিফের বলে তামিমের বিদায়। তিন ওভার শেষে স্কোর বোর্ডে ১০ রান ৩ উইকেট। এবার মায়ের বকুনি কানে গেল সাইফুলের। দ্রুত ভাত শেষ করে উঠে গেল সাইফুল। মন খুব খারাপ। এই খেলা দেখতে থাকলে মা এসে পেটাবে।

তবুও নতুন আশা জাগে সাইফুলের। আশরাফুল আছেন। সাকিব নেমেছেন। একটা পার্টনারশিপ হবে এখন। সাকিব ছেলেটা নতুন। একটু আস্তে ধীরেই ব্যাটিং করে। মিডল অর্ডারে একটা নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হয়ত পেল বাংলাদেশ। ছয় ওভার শেষ হওয়ার আগেই অধিনায়ক আশরাফুল আউট। ১৬ রানে ৪ উইকেট। নাহ। এবার আর বসে থাকা যায় না।

হয়ত বাজে একটা রেকর্ড হতে যাচ্ছে আজ। মুলতান স্টেডিয়ামটাই আমাদের জন্য খারাপ। ২০০৩ সালের ১ উইকেটে হারা সেই টেস্টের কথা মনে পড়ে গেল সাইফুলের। টিভির সামনে থেকে উঠে পাশের রুমের জানালার কাছে বসল সাইফুল। সকাল থেকে কত আশা নিয়ে বসে ছিল। কোন কাজই ঠিক ভাবে করা হল না। খেলতে গিয়েও খেলা হল না। এর প্রতিদান এভাবে দিল বাংলাদেশ? রাগের চেয়ে অভিমান হচ্ছে বেশি।

তৃতীয় ম্যাচটাও জয়ের কাছে গিয়ে হারতে হল। ৩০৯ রানের টার্গেটে ২৮৫ রান করেছিল বাংলাদেশ। কষ্ট যা পাওয়ার সেই ম্যাচেই পাওয়া হয়ে গেছে সাইফুলের।

আজে বাজে চিন্তা করতে করতে কখন যে পেরিয়ে গেছে একটা ঘন্টা, টেরই পায়নি সাইফুল। ম্যাচের কি অবস্থা? ৭০/৮০ রানে অল আউট হয়ে গেল? আবার গিয়ে টেলিভিশন ছেড়ে বসল সাইফুল। ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ৮৪ রান।

এর মাঝেই একে একে ফিরে গেছেন রিয়াদ, ফরহাদ রেজা আর ধীমান ঘোষ! ধীমান ঘরোয়া ক্রিকেটে এত রান করে আসল কিন্তু এ সিরিজে বলার মত কিছু করতে পারল না কেন? রান তো ভালোই আছে। কেউ একজন একটু রয়ে সয়ে খেলতে পারল না?

সাইফুল একটু অবাক হয়ে দেখল সাকিব ছেলেটা এখনো ক্রিজে আছে। ১৬ রান থেকে ৮৪ রান পর্যন্ত আসতে সাকিবের অবদানটাই বেশি। ছোট ছোট ৩ টি জুটিতে সাকিব রিয়াদের সাথে করেছেন ১৪ বলে ১৫ রান, রেজার সাথে করেছেন ২২ বলে ২০ রান আর ধীমানের সাথে ২ বলে ১ রান।

তার মানে ছেলেটা স্বাভাবিক খেলাটাই খেলছে। রাজ্জাকের সাথে অষ্টম উইকেটে খেলছে সাকিব। ২৫ রান যোগ করতেই আউট হলেন রাজ্জাক। করলেন ২৮ বলে ৭ রান। এবার যেন আর গায়েই লাগল না সাইফুলের। ভাবলেশহীন ভাবে খেলা দেখছে সে।

মাশরাফি নামলেন। দেখতে দেখতে খেলে ফেললেন ৩০ বল। আর অপর প্রান্তে সাকিব বলের সাথে পাল্লা দিয়ে রান তুলছেন। এ যেন নতুন কিছু। পরাজয়ের ভয়ে মাথা না নোয়ানোর দারুন এক নাটক মঞ্চায়িত হচ্ছে। আরো এক ঘন্টা চলে গেল। উইকেট পড়ছে না। মাশরাফি তার স্বাভাবিক ব্যাটিং করছেন না। ডট দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। হচ্ছে টা কি?

২৯ তম ওভারে রাজ্জাকের বিদায়ের পর চলে গেছে আরো ৮ ওভার। ৩৭ তম ওভারে ১৫০ এর কোটা ছুলো বাংলাদেশ। এর মাঝে সাকিব ও তুলে নিয়েছেন ফিফটি। রানের চাকা ঘুরছে একটু একটু করে। ৩৯ তম ওভারে সাকিব আর মাশরাফি কথা বলে নিলেন। নবম উইকেটে ৬৭ বলে রান এসেছে ৫০। মাশরাফির অবদান ২৪ আর সাকিব এনে দিয়েছেন ২৩ রান।

সাকিব এগিয়ে যাচ্ছেন এক ইতিহাস রচনার দিকে। একটু পর পরই চার মারছেন মাঠের বিভিন্ন দিক দিয়ে। যেন ঠান্ডা মাথায় পাকিস্তানী বোলারদের হতাশ করে যাচ্ছেন। দেখতে দেখতে কখন যে ৮ টি চার মেরে দিলেন বুঝতেই পারল না সাইফুল। ঠান্ডা মাথায় সাকিব তুলে নিলেন সেঞ্চুরী। ১১৫ বলে ১০০ রানের যে ইনিংসটা উপহার দিলেন তাতেই সাইফুলের মন ভরে গেল। এমন ইনিংস শুধু ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়ার ব্যাটসম্যানদেরই খেলতে দেখেছে সাইফুল।

৭০/৮০ রানে অল আউট হয়ে যাওয়ার ভয় তো চলে গেছে বহু আগেই। এখন স্কোরটা বড় হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সাইফুল। ৪৭ তম ওভারে হাটি হাটি পা পা করে ২০০ পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। এ যেন স্বপ্ন। ২০০ রানকে মনে হচ্ছে ২৮০ রান। আফসোস হতে লাগল সাইফুলের। আজকের দিনটা কত সুন্দর হতে পারত যদি অন্যরা আরো ভাল খেলতেন।

এখন হয়ত মাশরাফি মারবেন। কিন্তু তা আর হল না। ৪৮ তম ওভারে নবম উইকেট হিসেবে ফিরে গেলেন মাশরাফি। বাংলাদেশের রান ২০৬। মাশরাফি করলেন ৬৭ বলে ৩৮ রান। চার মেরেছেন মাত্র একটি। মাশরাফিকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল সাইফুল। ১১৮ বলে ৯৭ রানের জুটি ভাংলেন সেই মোহাম্মদ আসিফ। ততক্ষনে একটু মন ভালো হয়েছে সাইফুলের। ৫০ তম ওভারের প্রথম বলে সাকিব আউট হয়ে ফিরলেন শাহাদাত হোসেনকে সাথে নিয়ে। দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে ইচ্ছা করল সাইফুলের।

দলের রান মাত্র ২১০। সাকিব করলেন ১২০ বলে ১০৮ রান। জেতার আশা ও নেই। সাকিব আজকে হয়ত হেরেও জিতিয়ে দিলেন সাইফুলকে। “হয়ত” বলছি কারন খেলা তো শেষ হয়নি। জিতেও যেতে পারে বাংলাদেশ। মনে মনে অনেক কিছুই ভেবে ফেলছে সাইফুল।

২১১ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে কোন অঘটন ঘটল না। অনায়েসেই এই রান পার করে ফেলল পাকিস্তান। সালমান বাট আর বাজিদ খানের ফিফটিতে ৪৫ তম ওভারেই ৭ উইকেটে ম্যাচটা জিতে নিল পাকিস্তান।

হেরেও আজ মনটা ভালো সাইফুলের। সেই আসিফ ঠিকই ১০ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়ে নিল। মনের ভয় আর জয় করা হল না। সাকিব ৯ ওভার বোলিং করে ৩৪ রান দিয়ে ১ টি উইকেট নিল। লড়াকু ব্যাটিংয়ের জন্য ম্যান অফ দা ম্যাচ নির্বাচিত হলেন সাকিব।

হারলেও আজ যেন ভরসা করার মত আরেকজনকে পেল সাইফুল। যে কিনা মাঠে লড়াই করতে পারে। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে দলের হাল ধরতে পারে। আজ হয়নি। কাল হয়ত হবে। একদিন এই সাকিবকে দিয়েই হয়ত সাইফুলের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে। আজকে রাতের ঘুমটা হয়ত ভালো হবে সাইফুলের। বাংলাদেশ হারার পর ও এমন স্বস্তির ঘুম মনে হয় আর কোনদিন ঘুমায়নি সাইফুল।

Related Articles

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Articles